যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রফতানিতে ৩৫ শতাংশ শুল্ক আঘাতে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। তবে শুল্কহারের চেয়েও বড় চিন্তার বিষয় পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি। কেননা এর মধ্যে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যার প্রভাব দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি। সেটি নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। তার ঘণ্টাখানেক আগেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সব প্রস্তুতি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে গতকাল রাতে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এ তথ্য জানান।
ত্রয়োদশ নির্বাচন নিয়ে অগ্রগতি জানাতে গতকাল রাত ৮টার দিকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শফিকুল আলম জানান, সব প্রস্তুতি শেষ আর সংস্কারের কাজ হয়ে গেলে রোজার আগে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হতে পারে। নির্বাচন ঘিরে সব প্রস্তুতি ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করতে বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা। প্রস্তুতির মধ্যে অনেকগুলো বিষয় আছে। যেমন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে (পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড) ১৭ হাজার নতুন সদস্য নেয়া হচ্ছে। তাদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ যেন এ সময়ের মধ্যে শেষ হয়, সে বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশ দিয়েছেন। নির্বাচন সামনে রেখে অনেক পাঁয়তারা হয়, যাতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়। প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশ দিয়েছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাতে নির্বাচন সামনে রেখে আগামী মাসগুলোয় কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টা শুল্ক চুক্তি নিয়ে দ্বিতীয় দফা আলোচনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে গতকাল গণমাধ্যমকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে অবহিত করা হয়। প্রেস উইং জানায়, ৯-১১ জুলাই পারস্পরিক শুল্ক চুক্তি আলোচনায় অংশ নিতে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি কার্যালয় (ইউএসটিআর)।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর গত ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর উচ্চহারে পাল্টা শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) আরোপের ঘোষণা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা আসে। এ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে বাংলাদেশসহ অনেক দেশই শুল্ক কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেনদরবার শুরু করে। কোনো কোনো দেশ মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্কহার শূন্যের ঘরে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়। এর এক সপ্তাহের মাথায় গত ৯ এপ্রিল বাড়তি শুল্ক ৯০ দিনের জন্য স্থগিতের ঘোষণা দেন ট্রাম্প, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে গতকাল। তবে তার দুইদিন আগেই গত সোমবার বাংলাদেশী পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চিঠি পাঠান ডোনাল্ড ট্রাম্প। চিঠিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আগামী ১ আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো বাংলাদেশী সব পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। আর এ শুল্ক বর্তমানে খাতভিত্তিক যে শুল্ক দেয়া হয়, তার অতিরিক্ত হিসেবে প্রযোজ্য হবে। ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে পণ্য পাঠানো হলে সেখানেও এ শুল্ক প্রযোজ্য হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
নতুন শুল্কহার ঘোষণা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের পাশাপাশি আরো ১৩টি দেশকে সোমবার চিঠি দিয়েছেন। বাংলাদেশের পণ্যের ওপর এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার ছিল গড়ে ১৫ শতাংশ, এখন নতুন করে আরোপিত ৩৫ শতাংশ যুক্ত হলে এটি ৫০ শতাংশে দাঁড়াবে। আর তাতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। কেননা যুক্তরাষ্ট্রই বাংলাদেশী পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার।
নতুন করে আরোপিত শুল্কহারকে মাথায় নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করছে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি দল। এরই মধ্যে প্রতিনিধি দলটি সেখানকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা যদি শুধু শুল্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে বিষয়গুলো অনেক সহজ হতো। কিন্তু দরকষাকষি শুধু শুল্ক নিয়ে না, এরচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ চুক্তিতে থাকা বাণিজ্যিক বাধ্যবাধকতা বিষয়ক শর্ত; যা গোটা বিষয়টির জটিলতা শত গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া বাধ্যবাধকতাগুলো আবার অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের অর্থনীতির সক্ষমতার বাইরে। এমনকি সেগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
সূত্র আরো জানায়, দরকষাকষির আলোচনাটি শুল্কের চেয়েও বেশি বাণিজ্য বিধিমালা বিষয়ক। এমনকি সেগুলো শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিকও না। এর মধ্যে অনেকগুলো মন্ত্রণালয় ও খাতসংশ্লিষ্টদেরও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয় রয়েছে। বাণিজ্যবিষয়ক কিছু শর্ত একেবারেই অগ্রহণযোগ্য বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত বাংলাদেশের পক্ষে মেনে নেয়া প্রায় অসম্ভব।
রাজনীতিবিদ ও অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, চুক্তির মাধ্যমে যদি কোনো একটা নির্দিষ্ট দেশকে বা যুক্তরাষ্ট্রকেই শূন্য শুল্ক দেয়া হয়, তাহলে সেটা হবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের লঙ্ঘন। আবার চুক্তির মধ্যে থাকা শর্ত মেনে যেসব দেশ নিষেধাজ্ঞা পেয়েছে, সেসব দেশের ওপর যদি বাংলাদেশেরও নিষেধাজ্ঞা দিতে হয় তাহলে সেটাও ভয়াবহ ব্যাপার হবে। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে কোন দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে উঠবে সে প্রশ্নও রয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে খুব বড় দেশ না। যে শর্তগুলোর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, সেগুলো যদি সত্যি হয় তাহলে এটা খুব কঠিন সিদ্ধান্তের বিষয়। আর অনির্বাচিত সরকারের পক্ষে এ প্রেক্ষাপটে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরো কঠিন। আবার সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার বর্তমান সরকারের আছে কিনা সেটাও একটা বড় প্রশ্ন। সেজন্য এ কঠিন সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে ছেড়ে দেয়া ছাড়া উপায় থাকার কথা না।
জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যদি আমি অর্থনীতিটা চিন্তা করি তাহলে গত এক বছরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সফলতা আসে নাই। মূল্যস্ফীতি কমছে, ব্যাংক খাতে কিছু সংস্কার হচ্ছে, কিন্তু তার বাইরে তো অর্থনীতি খুব একটা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে না। এটা ধারাবাহিকভাবে চললে খুব একটা বেশিদূর এগোনো যাবে না। কেননা আমাদের তো বিনিয়োগ হচ্ছে না। বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চিত পরিবেশে বিনিয়োগও করতে চাচ্ছেন না। তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেখতে চান। এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য শুল্ক একটা বিশাল ধাক্কা হিসেবে বাংলাদেশের ওপর পড়বে। তখন আরো বেশি চাপ আসবে।’
নির্বাচন হলেই যে সবকিছুর সমাধান হয়ে যাবে ব্যাপারটা সে রকম না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অনিশ্চিত অবস্থা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার মতো বিষয়গুলোতে মানুষ পরিবর্তন দেখতে চায়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এলে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যাবে এবং দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা অন্তত বিনিয়োগ করতে উৎসাহ দেখাবে। চুক্তিতে যদি এমন কোনো কঠিন শর্ত থাকে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে আঘাত করতে পারে, তাহলে সেসব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সরকার ছাড়া অনির্বাচিত সরকার নিতে পারে না।’
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান দরকষাকষির বৈঠক নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হয়েছিল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে। বণিক বার্তাকে তিনি মঙ্গলবার বলেছিলেন, ‘এটা দেশের জন্য অনেক বড় ইস্যু। জনগণের জীবন-জীবিকা, আমাদের রফতানির এতগুলো লোকের চাকরি, কর্মসংস্থান এ চুক্তির মধ্যে জড়িয়ে আছে। এটা শুধু গার্মেন্টস না, সবকিছুর বেলায় প্রযোজ্য। দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও অনেক বড় বিষয়। এটা দেশের স্বার্থ, কোনো সরকারের স্বার্থ বা দলীয় ব্যাপার না। বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় বিষয়। দেশের স্বার্থে এসব জায়গায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’
দুর্ভাগ্যজনকভাবেই নিজেদের মধ্যে একটা আলাপ-আলোচনার কালচার গড়ে ওঠেনি বলে জানান তিনি। আমীর খসরু বলেন, ‘আলোচনার মাধ্যমে অনেক সময় অনেক কিছু বেরিয়ে আসে। আমাদের আশাবাদী হতেই হবে। এত বড় একটা বিষয় হাতছাড়া হয়ে গেলে তো আমাদের বিপদ হবে। আমাকে তো আশা নিয়ে বসতে হবে এবং নেগোসিয়েশনে আশা করি সফল হবে। এখনো তো কয়েকদিন আছে এজন্য আমি এ মুহূর্তে কোনো কোয়ালিফায়েড রিমার্ক করতে চাচ্ছি না। শেষ হোক তারপর দেখি। এটা তো পরবর্তী সরকারকেই বইতে হবে, সে যারাই আসুক। সরকারের জন্য এটা অনেক বড় ব্যাপার।’
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের বিষয়টি দেশের অর্থনীতিতে বড় রকমের প্রভাব ফেলবে এবং ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারীসহ সবাই এর মাধ্যমে প্রভাবিত হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শুল্কের বিষয়ে সরকারের ত্বরিত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এদিকে নির্বাচনের বিষয়ে প্রস্তুতি নেয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আজকে (গতকাল) বলা হলেও এর সঙ্গে শুল্কের কোনো যোগাযোগ নেই বলে আমি মনে করি। যেহেতু নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি আগে থেকেই নেয়া প্রয়োজন হয়, তাই সরকারের পক্ষ থেকে সেটিই করা হয়েছে। তার মানে এই নয় যে নির্বাচন ডিসেম্বরেই হবে।’
অনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনাটি একটি ফাঁদ হতে পারে বলে মনে করছেন ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (এফএসডিএস) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহি আকবর। আর চুক্তির শর্তগুলো নিয়ে যে গুঞ্জন সেগুলো যদি সঠিক হয় তা দেশ হিসেবে স্বাধীনভাবে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে খর্ব করবে বলেও উল্লেখ করেন এ নিরাপত্তা বিশ্লেষক। তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আমাদের ৯ জুলাই পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল। তার আগেই আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টসহ একটা টিম যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনার জন্য গিয়েছিল। ওই সময় ৩৭ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ, মানে বাংলাদেশের ওপর আরোপ হওয়া শুল্ক মাত্র ২ শতাংশ কমানো হয়। এটি আমাদের কোনোভাবেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি। এখন তারা (যুক্তরাষ্ট্র) যাদের নিষেধাজ্ঞা দেবে তাদের সঙ্গেও যদি ব্যবসা করতে না পারি তাহলে আমাদের যে সভরেইন অটোনমি (স্বাধীনভাবে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা) আছে সেটি খর্ব হবে। আমার কাছে মনে হচ্ছে এটার মধ্যে যাওয়া মানে আমি নিজেই নিজের হাতে একটি হ্যান্ডকাফ পরতে যাচ্ছি। যদি আমাকে তড়িঘড়ি করে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়, অবশ্যই এ অন্তর্বর্তী সরকার প্রশ্নের মুখে পড়বে।’
ফজলে এলাহি আকবর আরো বলেন, ‘অবশ্যই আমি মনে করি যে আমাদের সভরেইন অটোনমিতে স্যারেন্ডার করার অধিকার একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ার-বহির্ভূত। সরকার সবচেয়ে ভালো করবে এটাকে যদি তারা একটি নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেয়, জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে সবচেয়ে ভালো করবে। এটিকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাধীনতাকে খর্ব করার মতো একটা ফাঁদ মনে হচ্ছে আমার কাছে।’
এমন আলোচনার মধ্যেই নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করা নিয়ে তিনি বলেন, ‘এর সঙ্গে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার কোনো সম্পর্ক আছে কিনা, আমি জানি না। তবে একটার সঙ্গে আরেকটার সংযোগ আছে বলে কেউ যদি মনে করেন তাহলে সেটি অসম্ভবও কিছু না। আমি আশা করব এটা যেন সঠিক না হয়। কারণ এটা একটা সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নেয়া হয়েছে। দেশবাসী এটাই শুনতে পছন্দ করবে—এটাই আমার বিশ্বাস।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে নানা গুঞ্জনের মধ্যেই গতকাল রাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। রোজার আগে ভোটের বার্তা দিয়ে প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন নির্বাচন ফেব্রুয়ারি অথবা এপ্রিলে হবে। এর অর্থ হলো নির্বাচনের জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দরকার, সেটি প্রস্তুত করতে যা কিছু প্রয়োজন, তা এখন থেকেই শুরু করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গতকাল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীসহ আইন-শৃঙ্খলাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক বৈঠকে নির্বাচনের জন্য নানা প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দেন প্রধান উপদেষ্টা। ওই বৈঠকের আলোচনা ও নির্দেশনার বিষয়গুলো তুলে ধরে উপপ্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, বিগত তিনটি বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের এবার সরিয়ে রাখার চিন্তা করা হচ্ছে। ওইসব নির্বাচনে যেসব প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার দায়িত্বে ছিলেন, তাদের বাদ দিয়ে এবার নির্বাচনী কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া যায় কিনা, বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশও দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়েও মনিটরিং সেল গঠন করা হবে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে, যাতে অনিয়ম হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া যায়। এছাড়া এক থানার পুলিশকে অন্য থানার দায়িত্ব দেয়া যায় কিনা, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। উপপ্রেস সচিব বলেন, ‘বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। মূলত প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশনাগুলো দিয়েছেন। তার নির্দেশনার আলোকে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর সেগুলো বাস্তবায়ন করবে।’
সংবাদ সম্মেলেন প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘নির্বাচনকালীন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কীভাবে মোতায়েন করা হবে, এটা একটা ইস্যু। সীমান্ত এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে কীভাবে মোতায়েন করা হবে, কতজন আনসার, কতজন পুলিশ সদস্য থাকবেন, সেনাবাহিনী বা বিজিবি কীভাবে থাকবে, স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কীভাবে থাকবে, সেগুলো নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আট লাখের (আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য) মধ্যে ৫ লাখ ৭০ হাজার হচ্ছে আনসার এবং ১ লাখ ৪১ হাজার হচ্ছে পুলিশের সদস্য।’
বৈঠকে বলা হয়েছে ৪৭ হাজার ভোট কেন্দ্র থাকবে। তারা পর্যালোচনা করে দেখেছেন, ১৬ হাজারের মতো ভোট কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে কীভাবে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ করা যায়, সে জন্য প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রেস সচিব বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, আগে যে ধরনের নির্বাচন হয়েছিল, সেটা লোক দেখানো নির্বাচন। সেজন্য একটি প্রকৃত নির্বাচন কী করে আয়োজন করতে হয়, সেটির প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কার কী ভূমিকা, সেটি পরিষ্কার থাকতে হবে। দরকার হলে রিহার্সাল নির্বাচন (নির্বাচনের মহড়া) করতে হবে, যাতে করে অনুশীলন হয়। ভোটের সময় ইন্টারনেট যাতে সচল থাকে এবং প্রকৃত গণমাধ্যম যাতে দায়িত্ব পালন করতে পারে, এজন্য আগে থেকে কাজ করতে বলা হয়েছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষকের নামে যাতে কেউ দলীয় কর্মীকে নির্বাচনী কেন্দ্রে পাঠাতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশ দিয়েছেন।’